ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট দক্ষিণগাও বাজার এর পক্ষ থেকে সকল গ্রাহক, শুভাকাংখীসহ স

আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট দক্ষিণগাও বাজার এর পক্ষ থেকে সকল গ্রাহক, শুভাকাংখীসহ সবাইকে জানাই সালাম শুভেচ্ছা। এইগ্রুপে যারা আছেন তাদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার এলাকারসকলকে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ থেকে রেমিটপন্স পাঠানোর আহবান জানাচ্ছি। রাজারবাগ, কুসুমবাগ, দক্ষিনগাও, শাহীবাগ, মানিকদিয়া, বাইকদিয়া, নন্দিপাড়াসহ সকল এলাকার গ্রাহক, শুভাকাংখী, শুভানুধ্যায়ীদের প্রদত্ত মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হলোঃ ০১৭১১-৪৫৮১৫১, ০১৭০০৯২৫২৪১ ।

বৃহস্পতিবার, ২০ জুলাই, ২০১৭

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী স্মরণেঃ ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, লন্ডন।

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী
১লা ডিসেম্বর ১৯৮৫ সাল। শীতের সকাল। বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য স্বপরিবারে লন্ডন থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। অনেক আত্মীয়-স্বজন স্বাগত জানাতে আসবেন জানতাম। কিন্তু বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাইরে এসে দেখলাম সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা এবং চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। তখন তিনি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। আর আমি জামায়াতের প্রাথমিক সদস্যও নই। আমাকে বললেন, অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, তোমাকে নিয়ে মগবাজার কেন্দ্রীয় জামায়াত অফিসে যেতে হবে। স্ত্রী এবং শিশু-কিশোর তিন ছেলে-মেয়েকে ধানমন্ডির এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে আমি তাঁর গাড়ীতে করে মগবাজারের আল-ফালাহ ভবনে পৌঁছলাম। ভবনের দোতলায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠক চলছে। অধ্যাপক গোলাম আযম সভাপতিত্ব করছেন। নবীন ও প্রবীণ অনেক নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত। তাদের অনেকেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। মাওলানা নিজামী (যাকে আমরা নিজামী ভাই বলে ডাকতাম)সহ পাঁচজন শাহাদাতবরণ করেছেন।
নিজামী ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত অমায়িক। তিনি ছিলেন মৃদুভাষী। যতদূর মনে পড়ে তার সাথে লন্ডনে চারবার একসাথে সফর করেছি। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের একটি ইসলামী সংগঠনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমস্যা চলছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাঠান হয়। মাওলানা একে এম ইউসুফ, নিজামী ভাই এবং আমি। প্রতিনিধি দলে আমার অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা না। কিন্তু যেহেতু আমি দীর্ঘদিন ইংল্যান্ডে ছিলাম এবং ঐ সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম, সেকারণেই প্রতিনিধি দলে আমার অন্তর্ভুক্তি। বিমানে উঠে নিজামী ভাইয়ের সাথে অনেক কথা হলো। দেশের ভবিষ্যৎ, জামায়াতের ভূমিকা ইত্যাদি। তখন আমি জামায়াতের রোকন (সদস্য) হইনি। এর একটা বিশেষ কারণ ছিল। তখন যাদের ঘরে টেলিভিশন থাকত তাদেরকে সদস্য করা হতো না। আমি ঘরে টেলিভিশন রাখার পক্ষে নিজের যুক্তি উপস্থাপন করলাম। তিনি আমার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনলেন। অতঃপর তার বক্তব্য শুনে আমি সত্যিই স্তম্ভিত হয়েছিলাম। তিনি বললেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীতে এখনো সমাজের উপর শ্রেণীর লোকদেরকে একোমোডেট করার জন্য তৈরি করতে পারিনি, তুমিও তাদের একজন। যদিও আমি সমাজের উপরের শ্রেণীর লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না বা এখনো নই, কিন্তু নিজামী ভাই যে একজন বাস্তবধর্মী মানুষ ছিলেন এবং বাস্তবতাকে অসংকোচে মেনে নিতে পারতেন, এটাই তার একটা প্রমাণ।
যুক্তরাজ্যের ইসলামী সংগঠনটির সমস্যাটি ছিল বেশ জটিল। প্রতিনিধি দলের প্রধানের চাইতে তিনি অতি সহজেই সমস্যার গভীরে পৌঁছতে পেরেছিলেন। কিন্তু কথাবার্তা তিনি অত্যন্ত সংযতভাবে বলছিলেন। নেতার থেকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলেননি যাতে করে নিজেদের মাঝে কোন ভুল বুঝাবুঝি না সৃষ্টি হয়। তিনি সর্বদা প্রতিনিধি দলের প্রধানের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
১৯৮৮ সালে তিনি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হবার কিছুদিন পরে লন্ডনের উদ্দেশে এক সফরে বিমানে উঠে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে জামায়াত এবং দেশকে নিয়ে আপনার ভিশন কি? তার জবাবে কোন কৃত্রিমতা ছিল না। সাদামাটাভাবে বললেন, “আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমার বিদ্যাবুদ্ধিতে যা কুলায় তাই আমি করব।” তার এই অকৃত্রিমতার স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন তার জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত; ২০১৬ সালের ১১ই মে সন্ধ্যাবেলায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পরিবারের সাথে তার শেষ কথোপোকথনে।
নিজামী ভাইয়ের প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছে মাদরাসায়। তিনি ঢাকা আলিয়া থেকে কামিল পাস করেছেন। তিনি খুব ভাল ছাত্র ছিলেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। ইংরেজি ভাষায় খুব দক্ষতা না থাকলেও তিনি মোটামুটি ইংরেজি বলতে পারতেন। ঐ সফরে লন্ডনে বসবাসরত বিশ্বের অন্যান্য দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ তার সাথে দেখা করতে আসেন এবং তিনি নিজেই তাদের সাথে ইংরেজিতে আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের কথা বুঝতে এবং নিজের কথা তাদেরকে বুঝাতে তাকে কোন বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু একটা মজার ঘটনা ঘটল যখন তাকে নিয়ে পূর্ব লন্ডন থেকে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সে নির্বাচিত এমপি পিটার শোর সাথে দেখা করতে গেলাম। পিটার শোর এর সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘ দিনের। প্রায় প্রতিটি লন্ডন সফরে তার সাথে সাক্ষাৎ করি। এইবার নিজামী ভাইকে নিয়ে আরও দু’একজন বন্ধু-বান্ধবসহ তার সাথে দেখা করতে হাউস অব কমন্সে গেলাম। তিনি আমাদেরকে টেমস নদীর পাড়ে অবস্থিত একটি ক্যাফেটারিয়ায় নিয়ে গেলেন। পিটার শোর এবং নিজামী ভাই দুইজনই ইংরেজীতে কথা বলছেন। কিন্তু কেউ কারও ইংরেজী বুঝতে পারছেন না। তারপর আমাকে দোভাষীর দায়িত্ব পালন করতে হলো।
তিনি একজন ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার অধিকারী ছিলেন। ২০১০ সালের ২৯ জুন তিনি গ্রেফতার হন। মানবতা বিরোধী অপরাধে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় ২৮শে মে ২০১২ সালে। অতঃপর তার বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু হয়। প্রধান কৌসুলী হিসাবে ট্রাইব্যুনালে তার মামলা পরিচালনা করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
২০১৩ সালের কোন একসময় মরহুম সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী মামলা থেকে তার আইনজীবী প্রত্যাহার করে নেন। তার বক্তব্য ছিল বিচারের রায় তো আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে। সুতরাং আইনজীবীর মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালনা করা অর্থহীন। এর প্রভাব জামায়াতের অভিযুক্ত নেতৃবৃন্দের উপরও পড়ে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কানাঘুষা করছিলেন যে, আইনজীবীর মাধ্যমে বিচার কার্য পরিচালনা করে কেন আমরা এই বিতর্কিত বিচার প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিচ্ছি। এই অবস্থায় ট্রাইব্যুনালে একদিন আমি নিজামী ভাই, মুজাহিদ ভাই এবং কামারুজ্জামান ভাইকে বলালাম: আইনজীবীরা মামলা পরিচালনা করেন তাদের মক্কেলের পরিষ্কার এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতে। আপনারা যদি মনে করেন এই মামলা থেকে আইনজীবীদেরকে প্রত্যাহার করবেন তাহলে আগামীকাল থেকে আমরা আর ট্রাইব্যুনালে আসব না। যতটুকু আমার মনে পড়ে কামারুজ্জামান ভাই বললেন, কোর্টের এই পরিবেশে মামলা পরিচালনা করে কি লাভ? মুজাহিদ ভাই বললেন: আমি চিন্তা করে বলব। নিজামী ভাই সরাসরি এবং অত্যন্ত সহজেই বলে ফেললেন: রাষ্ট্রপক্ষকে একতরফাভাবে মামলা পরিচালনা করতে দেয়াটা সঠিক হবে না। মরহুম সালাহ উদ্দিন চৌধুরী নিজে দুচারদিন মামলা পরিচালনা করে পুনরায় আইনজীবী নিয়োগ করেন। শেষ পর্যন্ত সুপ্রীম কোর্টে তার আপীল এবং রিভিউ দুটা মামলাই সিনিয়র আইনজীবী জনাব খন্দকার মাহবুব হোসেন পরিচালনা করেন।
জামায়াত নেতৃবৃন্দের মামলা আইনজীবীদের মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে কিনা এ নিয়ে জামায়াতের ভিতরে এবং বাইরে বেশ গুঞ্জন ছিল। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের অনেক আইনজীবীও (যারা জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত নন) এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল এভাবে বিতর্কিত এই আইনী প্রক্রিয়াকে বৈধতা প্রদান করা হচ্ছে।
আসল কথা হচ্ছে যারাই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করেছিলেন, তাদের সকলের মতই ছিল আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা পরিচালনার পক্ষে। অর্থাৎ তারা সকলেই নিজামী ভাইয়ের সাথে একমত হয়েছিলেন। শুরুতে আমরা সিনিয়র আইনজীবী কেউই ট্রাইব্যুনালে যাইনি। আমাদের পক্ষ থেকে এডভোকেট তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল মামলা পরিচালনা করছিল। উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে আমি যেদিন প্রথম ট্রাইব্যুনালে গেলাম, বিএনপির বারের শীর্ষ পর্যায়ের আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সুপ্রিম কোর্ট বারের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, এককালীন বারের সভাপতি জনাব জয়নাল আবেদীন, মি: নিতাই রায় চৌধুরীসহ আরও অনেক আইনজীবী আমাদের সাথে ছিলেন। পরবর্তীকালে জনাব খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ অনেকেই আমাকে বলেছিলেন: “আপনাদের এই মামলা থেকে প্রত্যাহার করা উচিত।”
আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের বাসায় এক নৈশভোজে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদও আমাকে এই কথাটা বলেন। আইনজীবী উইথড্র না করার ব্যাপারে আমি তখন তাকে তিনটি যুক্তি দিয়েছিলাম; এক: আমাদের মক্কেলদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সকল যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, সারবত্তাহীন এবং যে আইনে বিচার হচ্ছে তা আমাদের দেশীয় আইনের মাপকাঠি এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ডের অনেক নিচে তা প্রমাণ করা। দুই: আমাদের মক্কেলরা চান যে, আমরা এই বিচারকার্য পরিচালনা করি। তিন: বিচারকার্য যেন তড়িঘড়ি করে শেষ করা না হয়। আমার এই কথাগুলো শুনে মওদুদ ভাই বলেছিলেন: “আমরা যদি ভাবাবেগ নিয়ে চিন্তা করি তাহলে এই মামলা থেকে উইড্র করা উচিত। কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে এই মামলা থেকে প্রত্যাহার করা ঠিক হবে না।”
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মাওলানা নিজামী তার শাহাদাতবরণের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৬ বছর কারাগারে ছিলেন। ট্রাইবুনাল থেকে সুপ্রীম কোর্ট পর্যন্ত তার মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন আদেশ এবং রায় হয়েছে। কোন সময় তিনি এই মামলা থেকে আইনজীবী প্রত্যাহারের কথা বলেননি। তিনি যে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারতেন এটা তার একটি প্রমাণ।
চিন্তার ক্ষেত্রে ভিন্ন মতামত অবলম্বনকারীদের দৃষ্টিভঙ্গী তিনি বুঝতে পারতেন এবং এ ব্যাপারে তিনি অনেক উদার ছিলেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। ২০০৮ সালের একটি ঘটনা। লন্ডনে ছোট-খাট পরিসরে বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনসমূহের নেতৃবৃন্দের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক খুরশিদ আহমদ, মালয়েশিয়ার ইসলামী আন্দোলন পাস-এর তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন মাতইসা, তুরস্কের সাদাত পার্টির তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) তেমিল কারামাল্লাহওগলুসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। মাওলানা নিজামী ছিলেন প্রধান অতিথি। আমিও সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম। ঐ সম্মেলনে আমরা উভয়েই লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করি। কিছু কিছু ব্যাপারে বিশেষ করে আন্দোলনে মহিলাদের ভূমিকার ব্যাপারে তাঁর সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করি। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহনশীল। আমার বক্তব্যের ব্যাপারে তিনি কোনদিন কোন উষ্মা প্রকাশ করেননি। এটাই ছিল তার সর্বশেষ বিলাত সফর। ঐ যাত্রায় আমি প্রথমে লন্ডন পৌঁছি, তারপর তিনি সস্ত্রীক লন্ডনে পৌঁছেন। তিনি এর আগে বেশ কয়েকবার যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু ঐবার ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন তার সাথে ভাল আচরণ করেনি। দেশে ফেরার সময় তিনি আমার সাথে একসাথে ভ্রমণ করতে চাইলেন যাতে করে কোনরকম বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমানে এটাই ছিল তার সাথে আমার সর্বশেষ সফর। দেশে ফিরে এসে কোন একটা বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিসে একান্তভাবে তাঁর গঠনমূলক সমালোচনা (মুহাসাবা) করলাম। আমি আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলাম আমীর এ জামায়াত হয়েও তিনি অত্যন্ত খোলামনে এবং অকপটে বিষয়টি স্বীকার করে নিলেন। দুঃখের বিষয় যে আজকে অনেক ক্ষেত্রেই এধরনের খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ নেই।
আন্দোলন সংগ্রামে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার সাথে আমার মতের মিল ছিল। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে আমি তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতাম। যেসকল বিষয় নিয়ে দ্বিমত ছিল, সেগুলো নিয়ে তার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে কখনই সমস্যাবোধ করিনি। তিনি ভিন্নমতকে বুঝতে ও সমন্বয় করতে চেষ্টা করতেন। তিনি ছিলেন মহিলাদের সম্পূর্ণভাবে মুখ ঢাকার (নেকাবের) পক্ষে। আমি নেকাবের বিপক্ষে নই, কিন্তু আমি মনে করি মুখ খোলা রেখে হিজাবও সম্পূর্ণ ইসলামসম্মত। শুধুমাত্র হিজাব এবং নেকাবেব মাধ্যমে কারও তাকওয়া পরিমাপ করা যাবে না। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে মিসরের ইসলামী আন্দোলনের অগ্রসেনানী হামিদা কুতুবের জীবন। তিনি তার ভাই সাইয়েদ কুতুব শহীদের সাথে অভিযুক্ত হন এবং তাঁর ভাইয়ের ফাঁসী কার্যকর হওয়ার পর ৬ বছর ১০ মাস মিসরের কারাগারে ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি জেল থেকে বের হন। ১৯৭৬ সালের গ্রীষ্মকালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন ফসিস-এর কনফারেন্সে তার সাথে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়। তিনি নিকাব পড়তেন না কিন্তু হিজাব করতেন। কারাগারে রাতদিন বইয়ের সম্মানিতা লেখকও শুধু হিজাব করতেন, নিকাব পড়তেন না। একদিন জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিসে বসে নিজামী ভাইয়ের সাথে এ বিষয়ে আমার কথা হচ্ছিল। আমি আমার যুক্তি-প্রমাণ তার সামনে তুলে ধরার পর, তিনি বিষয়টির একটি উত্তম সমাধান দিয়েছিলেন। কিভাবে মহিলারা হিজাব করলে নিকাবের কাছাকাছি হয় তার একটি বাস্তব উদাহরণ তিনি আমাকে দেখালেন। দুটি বিবদমান বিষয়কে সমন্বিত করার তার যে একটা অসাধারণ গুণ ছিল, এর প্রমাণ আমি সেদিন পেয়েছিলাম।
কৃষিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় একবার তিনি দেশের বাইরে খুব সম্ভবত ইতালির রাজধানী রোমে একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এই সফরে তার সফর সঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্সের অন্যতম একজন প্রতিনিধি বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী জনাব আব্দুর রউফ চৌধুরী। মরহুম জনাব আ: রউফ চৌধুরী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী এবং পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেনজীর ভুট্টো তার সহপাঠী ছিলেন। অনেক মামলায় জনাব রউফ চৌধুরীর আইনজীবী হিসাবে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। আইন আদালতের অঙ্গনের বাইরেও তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। তিনি নিজামী ভাইয়ের কোমল ব্যাবহারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
নিজামী ভাই দুই বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথম নির্বাচিত হন এবং সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের নেতৃত্ব দেন। এর আগে সংসদে বক্তৃতা করার কোন সুযোগ তাঁর জীবনে আসে নাই। কিন্তু সংসদে তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত ধীরস্থীর এবং ভারসাম্যপূর্ণ। হাইকোর্টের বারান্দায় একদিন সিনিয়র আইনজীবী জনাব খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমদ ( তিনি বাংলাদেশের সেরা আইনজীবীদের মধ্যে একজন ছিলেন) আমাকে বললেন: “এটা অনেকটা আশ্চর্যের ব্যাপার যে মাওলানা নিজামী কাউকে কটাক্ষ বা আঘাত না করে অত্যন্ত শালীন ভাষায় সংসদে নিজের বিচার বিবেচনাপূর্ণ বক্তব্য পেশ করতে পারেন।”
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং প্রাক্তন বিচারপতিদের সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এক সন্ধ্যায় আমি তাকে নিয়ে প্রাক্তন বিচারপতি কে এএম সোবহান সাহেবের বাসায় যাই। এর কিছুদিন পর বিচারপতি কে এম সোবহান আমাকে বললেন- কোন এক জেলার আওয়ামী লীগের একজন নেতা তাঁকে বলেছেন- মাওলানা নিজামী অন্যকোন দলকে আক্রমণ না করে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তাঁর বক্তব্য পেশ করেছেন। ৫ম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ সদস্য প্রয়াত শুধাংসু শেখর হালদার ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে খানিকটা অসৌজন্যমূলক বক্তব্য রেখেছিলেন। এতে করে সংসদে বেশ কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। হালদার বাবু অনেকটা বেকায়দায় পড়েন। শেষ পর্যন্ত মাওলানা নিজামী তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। সেই সময়ে আমরা কয়েকজন বন্ধু একসাথে ধানমন্ডি লেকের পাশে মর্নিংওয়াক করতাম। আওয়ামী সমর্থক আমার একজন ব্যারিস্টার বন্ধু (যিনি পরে বিচারপতি হয়েছিলেন) হাসতে হাসতে বললেন, শেষ পর্যন্ত নিজামী সাহেবই হালদার বাবুকে বাঁচিয়ে দিলেন।
ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে সর্বমোট ১৬টি অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্যে একটি অভিযোগ ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা সংক্রান্ত। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনে নাই। বিলাতের নামকরা সাময়িকী দি ইকোনোমিস্ট স্কাইপ কেলেংকারীর সকল ঘটনা ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশ করে। ইকোনোমিস্টকে অনুসরণ করে দৈনিক আমারদেশ পরপর তিনদিন তৎকালীন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি জনাব নিজামুল হক নাসিমের সাথে ব্রাসেলসে অবস্থানরত আইনজীবী আহমদ জিয়াউদ্দিনের কথোপকথন হুবহু প্রকাশ করে।
স্কাইপ কেলেংকারীর পর যে সমস্ত নথিপত্র আমাদের হাতে আসে তা থেকে দেখা যায় ২১শে মে ২০১২ সালে ট্রাইব্যুনালের মাননীয় চেয়ারম্যানের প্রস্তাবিত অভিযোগ গঠন আদেশের খসড়া আইনজীবী আহমেদ জিয়াউদ্দিনের কাছে ইমেইল করেন। তাতে মাত্র ১৫টি অভিযোগ ছিল, বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগটি পরে আহমদ জিয়াউদ্দিন যোগ করেন।
বিচারপতি নাসিম গণআদালতের তদন্ত কমিটির সদস্য হয়েও ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি হিসাবে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। যদিও চূড়ান্ত রায় দেয়ার পূর্বে তিনি পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ সর্বমোট ২৬জন সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ পায়। মাওলানা নিজামীর ১৬টি অভিযোগের বিরুদ্ধে মাত্র ৪জন সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়। তিনি যে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এতে কোন সন্দেহ নেই।
তার বিরুদ্ধে আনীত ১৪ নং অভিযোগ ছিল তিনি সূরা তাওবার ১১১-১১২ নং আয়াতের তাফসীর (ব্যাখ্যা) করে মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছেন। ভাবতে অবাক লাগে! কেমন করে আমাদের রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ কৌঁসুলিরা তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনতে পারলেন! তাহলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যারা সূরা তাওবার এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন তারা কি অপরাধী? নুরেমবার্গ থেকে শুরু করে কম্বোডিয়া পর্যন্ত কোন দেশের যুদ্ধাপরাধের আইনের সংজ্ঞায় এই অভিযোগ যে পড়ে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর বিচারপতি জনাব নাসিম পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর বিচারপতি জনাব এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে এই ট্রাইব্যুনালের সামনে আমি ২ দিন ধরে নিজামী ভাইয়ের পক্ষে সাবমিশন রাখি। ১৪ নং অভিযোগের জবাবে (সূরা তাওবা সংক্রান্ত) কি সাবমিশন রেখেছিলাম, তা আজ আমার মনে নেই। (অবশ্য নিজামী ভাইকে এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল দোষী সাব্যস্ত করেনি)। তবে একটা কথা আজ মনে পড়ছে – জানি না তা কতটা প্রাসঙ্গিক- শহীদ নিজামীর শাহাদাতের প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বে শাহাদাতবরণকারী তার’ প্রিয় সাথী’ শহীদ মালেকের কাছে সূরা তাওবা ছিল খুবই প্রিয়।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মাননীয় বিচারপতি জনাব এটিএম ফজলে কবীর ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে নিজামী ভাইয়ের মামলার রায় না দিয়েই অবসরে যান। ফলে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি জনাব ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। আব্দুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের শাহাদাতের ৫ দিন পর আমি মাত্র ২ সপ্তাহের জন্য ২০১৩ সালের ১৭ই ডিসেম্বর লন্ডনের পথে ঢাকা ত্যাগ করি। আজ পর্যন্ত আমার আর দেশে ফেরা হয় নি। আমি বিলাতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছি। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক হল যে, বিচারপতি জনাব ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে গঠিত ২য় ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রীম কোর্টে আপীল এবং সর্বশেষ রিভিউ শুনানিতে নিজামী ভাইয়ের কৌঁসুলী হিসাবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
এটা সত্য যে, নিজামী ভাই পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেজন্য তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালে দালাল আইনে অভিযোগ আনা যেত। কিন্তু দালাল আইনের অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা হয় নি। ১৯৮৬ সালের অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথম অংশগ্রহণ করেন এবং বিপুলসংখ্যক ভোট লাভ করে জাতীয় রাজনীতিতে সম্ভাবনাময় নেতা হিসাবে আভির্ভূত হন। এই নির্বাচনের পরেই তার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ উঠে যে, তিনি আল বদরের কমান্ডার ছিলেন। মানবতা বিরোধী অপরাধের যে সব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে সেগুলো অসত্য এবং তার কোন আইনগত ভিত্তি নেই। বিচারকার্য যদি আন্তর্জাতিক মানদ- অথবা দেশীয় আইন অনুযায়ী, যেখানে বাংলাদেশের সংবিধান প্রযোজ্য হত, তাহলে একজন আইনজীবী হিসাবে আমি নির্দিধায় বলতে পারি তিনি বেকসুর খালাস পেতেন।
নুরেমবার্গ, প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া, রুয়ান্ডা, সিয়েরালিয়ন, কম্বোডিয়া, লেবাননসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে বিগত ৭০ বছরে অনেকগুলো যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকল ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্য ছিল বিচারকার্য পরিচালনার মাধ্যমে জাতির একটি ক্ষত নিরাময় করা এবং জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করা। কিন্তু বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারই হচ্ছে এর একমাত্র ব্যাতিক্রম। ফলস্বরূপ জাতির মধ্যে বিভাজন আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচারের পক্ষে আমি ছিলাম এবং এই ধরনের বিচার হলে নিজামী ভাইসহ আরও অনেকেই যে নির্দোষ প্রমাণিত হতেন তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বাংলাদেশে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরামর্শ অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ বিচার কার্য পরিচালনা করা হত, তাহলে দেশ ও জাতি মাওলানা নিজামীর মত একজন মানুষের সেবা থেকে বঞ্চিত হত না। যার উত্তম স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় পরিচালনার মাধ্যমে।
তিনি প্রশান্ত মনে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করেছেন। কোন একটি ইসলামী দলের প্রধানের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দেয়ার এটাই প্রথম নজির। এর আগে ১৯৪৯ সালে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রধান হাসানুল বান্না আঁততায়ীর হাতে কায়রোর রাজপথে নিহত হন। ১৯৬৬ সালে মিসরে সাইয়েদ কুতুবকে যখন ফাঁসি দেয়া হয় তখন তিনি ইখওয়ানের প্রধান দায়িত্বশীল ছিলেন না। ১৯৩১ সালে ইতালীর ঔপনিবেশিক শাসকরা যখন লিবিয়ায় ওমর আল মুখতারকে ফাঁসি দেয় তখন তিনি ইতালির ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির ভূমিকা পালন করছিলেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের একটি সামরিক আদালত মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর বিরুদ্ধে ফাঁসীর আদেশ দিলেও পরবর্তীকালে তা মওকুফ করা হয়। অনুরূপভাবে ১৯৫৪ সালে ইখওয়ান প্রধান হাসসান আল-হুদাইবির বিরুদ্ধে ফাঁসীর আদেশ দেয়া হলেও স্বাস্থ্যগত কারণে তা মওকুফ করা হয়। কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে এবং যুদ্ধকালীন সময়ে কোন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী না হয়ে মানবতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধের অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার উদাহরণ দুনিয়ার ইতিহাসে এটাই প্রথম। ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের পূর্বে তাঁর মানসিক অবস্থা কি ছিল তা জানা যায় তাঁর তৃতীয় ছেলে ড. নাঈম খালেদের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে। তিনি কারও প্রতি কোন ক্ষোভ প্রদর্শন করেননি, কাউকে দোষারোপ করেননি। এটাই প্রমাণ করে তিনি কত বড় মাপের মানুষ এবং ধৈর্যশীল ছিলেন। খালেদের লেখা পড়ে সূরা ইবরাহিমের ১২নং আয়াতের কথায় আমার মনে পড়ে, যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর আমরা আল্লাহরই ওপর কেন ভরসা করবো না, যখন তিনি আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন!! তোমরা আমাদের উপর যে অত্যাচার করছ, তার জন্য আমরা সবর করবো এবং ভরসাকারীদের আল্লাহরই ওপরই ভরসা করা উচিত।”
ফাঁসির মঞ্চে চড়ে দুনিয়া থেকে বিদায়ের পূর্ব মুহূর্তে বিশ্বজাহানের মালিক প্রভু পরওয়ারদিগারের পথে শেষ যাত্রার যখন তিনি পথিক তখন তাঁর অনুভূতি কি ছিল, কি তিনি বলেছিলেন, কি প্রার্থনা করেছিলেন- দুনিয়াবাসীর তা জানার কথা নয়। তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই জীবনের ঐ শেষ মুহূর্তে মাওলানা নিজামী যদি বলে থাকেন- “হায়!! আমার জাতির লোকেরা যদি জানত আমার প্রভু আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।” (সূরা ইয়াসিন- ৩৬:২৭)।
শেষ বিচার শেষ হলে পরে যারা তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবেন তারাই শুধু জানতে পারবেন তাঁর শেষ কথা কি ছিল।
দৈনিক সংগ্রাম

মিশরের ঐতিহাসিক আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুক্ষণ: জিয়া হাবীব আহসান, এডভোকেট

২৮শে জানুয়ারি’১৭ শনিবার ঐতিহাসিক তুর পাহাড় তুরে মুসা(আঃ) পরিদর্শন শেষে মিশরের পর্যটন নগরী শার্ম আল শেইখ-এ আমাদের নির্ধারিত হোটেল ইAmwaz Resort- এ পৌঁছলাম, তখন রাত প্রায় ৯টা। ৪ তারকা মানের হোটেলটির সৌন্দর্য এবং পারিপার্শ্বিক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে সফর সঙ্গী সবাই উৎফুল্ল। বাস থেকে নামার সাথে সাথে ওয়েলকাম ড্রিংকস্‌ এর মাধ্যমে উষ্ণ অভ্যর্থনার পর যার যার লাগেজ রুমে রুমে পৌঁছে গেল। ভিজিটরস টিম লিডার প্রফেসর ড. বি. এম. মফিজুর রহমান আল্‌-আযহারী দ্রুত খাওয়ার পর্ব সেরে নেয়ার তাগিদ দিলেন। খাবার কক্ষে এসে দেখি এ এক বিশাল আয়োজন। ইতালিয়ান, তার্কি, এরাবিয়ান ফুডসহ বুফে আইটেমে নানা পদের বার্বি কিউ, সী ফুড, নান, ডিম, ব্রেড, বীফ, ভেজিটেবল, পিঁয়াজু (মিশরী নাম ত‘আমিয়্যাহ), ডেট বেভারেজ, ফ্রেশ জুস, তার্কিস কফি, পুডিং, মিষ্টি, হালুয়া, মোভেন পিক, আইসক্রিম আরো কতো কি সাজানো পশরা দেখে ঘুরে ঘুরে পছন্দের খাবার খাচ্ছিলাম। আবার পছন্দের খাবার অর্ডার দিয়েও খাচ্ছেন অনেকে। হোটেলে রয়েছে বিরাট চিলড্রেন এন্টারটেইন্টমেন্ট, মিনি কিডস্‌ ক্লাব, সুইমিং পুল (চিলড্রেন, লেডিস, জেন্টস) ওয়াটার াইড, স্পোর্টস, মিউজিক, গলফ গেইমস, সংগীত, নৃত্য, টেনিস কোর্ট, ফিটনেস সেন্টার, ভলিবল সহ বিভিন্ন আয়োজনে ভরা খুব বিশাল রিসোর্ট এলাকা। দিনভর তুর পাহাড় যাওয়া আসায় জার্নিতে ক্লান্ত শ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও আমার মেজ পুত্র যাওয়াদ, ভগ্নিপতি এড. আনোয়ার সহ টিমের ১৮জন সদস্য-সদস্যারা সব ঘুরে ফিরে দেখছিলাম। পরদিন সকাল ২৯শে জানুয়ারি আমরা পর্যটন নগরী স্বপ্নপুরী শার্ম আল-শেখ কে বিদায় জানাবো। রাতে সব ঘুছিয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোর সকালে অনেকেই সমুদ্র স্নানে গিয়ে ফিরে এলেন। নাস্তা সেরে অপেক্ষমাণ বাসে উঠে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু। সকালে নীল এয়ারের একটি ডোমেষ্টিক ফ্লাইটে ১ঘন্টা আকাশে উড়ে আমরা মিশরের রাজধানী কায়রো বিমান বন্দরে অবতরণ করি। ওখানে আমাদের প্রিয় গাইড আহমেদ অপেক্ষমাণ ছিলেন। বাসে উঠে কায়রো পৌঁছে আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠ বিখ্যাত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় দেখানোর জন্য। প্রশস্ত পীচ ঢালা কালো পথ বেয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো। প্রফেসর ড. আযহারী বললেন, হোসাইনিয়্যাহ এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক জামেউল আয্‌হার। এই এলাকার নামকরণ করা হয়েছে হযরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর নামের সাথে মিল রেখে। জামেউল আযহারের অপর পার্শ্বেই রয়েছে আরেকটি মসজিদ। যা জামেউল হুসাইন নামে পরিচিত। রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে রয়েছে আল্‌-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি ও প্রধান ক্যাম্পাস এবং মসজিদুল আযহার। এই মসজিদুল আযহারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের অন্যতম পাদপ্রদীপ জামে‘আতুল আয্‌হার বা আল্‌-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রবৃন্দ যেমন আসে অধ্যয়ন করার জন্য, তেমনি গবেষকবৃন্দও এখানে আসেন গবেষণা করার জন্য। এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ফাতেমী বংশের খলীফা ময়েয-লি-দিনিল্লাহ্‌। ৩৬১ হিজরী মোতাবেক ৯৭২ ঈসায়ী সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ব্যাপারে ভিন্ন মতও রয়েছে। কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, মিশরে ফাতেমী খলীফা ময়েয লি-দিনিল্লাহ্‌র শাসনামলে খলীফা কর্তৃক ৩৫৯ হিজরী ২৪শে জুমাদিউল উলা মোতাবেক ৪ এপ্রিল ৯৭০ খ্রিস্টাব্দের জামে আল আযহার প্রতিষ্ঠা করা হয়।
কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, ফাতেমী খলীফা ময়েয লি-দিনিল্লাহ্‌র ক্রীতদাস জাওয়ার আল কাতিব যখন কায়রো নগরী আবাদ করেন, তখন তিনি মসজিদুল আয্‌হার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম অনুসারেই এই মসজিদ ও আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে। আবার আরেক ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত ফাতিমাতুয যাহরা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার নামের ‘যাহ্‌রা’ শব্দটি অবলম্বনে ‘আল আযহার’ নামকরণ করা হয়েছে। বিশাল এই মসজিদে ৩০ হাজার মুসল্লী একত্রে জামায়াতে নামায আদায় করতে পারে। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ২ লক্ষেরও বেশি। গেটে রয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মেহমানদের বসার সুন্দর আয়োজন। এখানে রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও মসজিদ এবং পূর্ব পাশে জামেউল হুসাইনের পাশ্বেই একটি দৃষ্টিনন্দন মাযার।
কোনো কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন, এখানে ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুর মাথা মোবারক দাফন করা হয়েছে। ইরাকের কারবালা প্রান্তরের বেদনা বিধূর ঘটনা প্রত্যেক মুসলমানেরই কম বেশি জানা রয়েছে। তাঁকে শহীদ করার পর তাঁর পবিত্র মাথা মোবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তা কুফায় প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে মাথা মোবারক সিরিয়ার দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে পাঠানো হলে সেখানের উমাইয়া মসজিদের মাঠে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে দাফনকৃত মাথা মোবারক উঠিয়ে আস্কালানে নিয়ে দাফন করা হয়। ৫৪৮ হিজরীতে ক্রুসেডে যুদ্ধের সময় পবিত্র মাথা মোবারকের মর্যাদাহানি হতে পারে, এ আশঙ্কায় সেখান থেকে উঠিয়ে মিশরের কায়রো নগরীতে দাফন করা হয়। একে কেন্দ্র করে বিশাল এক মাযার ও সুদৃশ্য মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। অবশ্য নির্ভরযোগ্য তথ্যানুসারে, কায়রোতে ইমাম হোসাইনের মস্তিষ্ক দাফনের বিষয়টিতে মত পার্থক্য রয়েছে ।
এই মাজারে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করে থাকে। মাজারের পশ্চিম পার্শ্বে একটি কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লামের পবিত্র দাড়ি মোবারকের কয়েক গুচ্ছ, তাঁর ব্যবহৃত উটের জ্বীন ও মিসওয়াক। এই কক্ষটি বিশেষ সময় খুলে দেয়া হয়। জামেউল আল-আযহার বা আল-আয্‌হার মসজিদের পিছনেই রয়েছে একটি গলিপথ। এই পথের ধারেই রয়েছে আল্লামা ইমাম বদরুদ্দিন আইনী (রাহঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও মসজিদ। এখানেই তাঁর মাজার অবস্থিত। এই মাদ্রাসা তিনি ৮৪২ হিজরি সনে প্রতিষ্ঠা করেন। এটিও একটি প্রাচীন ও বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আল্‌-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ক্যাম্পাসের অদূরেই রয়েছে খান-এ খলীলী নামক প্রত্নতাত্ত্বিক বিশাল মার্কেট। যেখান থেকে আমরা পেপিরাস পেপারসহ নানাধরণের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ক্রয় করি।
আজ আমাদের নিয়ে আসা হলো কায়রোর অন্যতম নতুন শহর মাদীনাতুন নসরে অবস্থিত আল্‌-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে। বিশাল ক্যাম্পাস, ছাত্র-ছাত্রীরা ঢুকছে-বের হচ্ছে। বেশ কড়া কড়ি, উঁচু প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত এ বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বত্র সি.সি ক্যামেরা এবং দেয়ালের উপর কাঁটা তারের বেড়া। আবুল ফাত্তাহ আল সিসি বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ ঠেকাতে এ ব্যবস্থা জানতে পারলাম। যাক আমাদের টিম লিডার আল আযহার এর প্রাক্তন ছাত্র ড. মফিজুর রহমান আযহারীর অনুরোধে আমরা নতুন ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ ঘুরে দেখার অনুমতি পেলাম। কিছুক্ষণ ক্যাম্পাস ঘুরে দেখলাম। এ বিশাল ক্যাম্পাস দেখতে গাড়ি নিয়েও পুরোদিন প্রয়োজন হবে। আল্‌-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় এর আরবি নাম জামি‘আতুল আল্‌-আযহার। এটি আরবি সাহিত্য, ইসলামিক স্টাডিজ, কুরআনিক সাইন্সেস, হাদিস, ইসলামী আইন শিক্ষাসহ যুক্তি বিদ্যা, ব্যাকরণ, অলংকার শাস্ত্র সহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক ডিসিপ্লিন দ্বারা সমৃদ্ধ একটি অত্যাধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়, যা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম এবং মিশরের প্রথম ডিগ্রি গ্র্য্রান্টিং ইউনিভার্সিটি। ইসলাম ধর্মের আদর্শ প্রচার এবং ইসলামী সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানোর উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। টিম লিডার থেকে জানতে পারলাম আল-আযহারের সর্বোচ্চ পদধারী কে বলা হয় শায়খুল আযহার। তিনি পদাধিকার বলে মিশরের গ্র্যান্ড ইমাম বা ইমামুল আকবর। শায়খুল আযহার পদ একটি সাংবিধানিক পদ এবং এই পদে নিয়োগ পার্লামেন্টের মাধ্যমে দেশের প্রেসিডেন্ট করে থাকেন। জানতে পারলাম বাংলাদেশ থেকে এখানে প্রতি বছর মাত্র ১৫জন ছাত্র কোটা হিসেবে আসার সুযোগ পায়, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। অথচ বাংলাদেশ পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। এ ব্যাপারে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগপৎ ভূমিকা আবশ্যক। ফিরে আসার পর পথে নিজেই দেখলাম একটি মসজিদে সেনা প্রহরা এবং তালা দেয়া। গাইড বললেন,“মসজিদটির নাম মসজিদে “রাবিয়াহ আল-‘আদউয়্যাহ”। এখানে ২০১৩ সালে রমজান মাসে সিসি বিরোধী বিক্ষোভ ও অবস্থান শুরু হয়ে প্রায় ৪৫দিন চলতে থাকে। সেনা সমর্থক মিশরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবুল ফাত্তাহ আল সি. সি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাগারে পাঠালে লক্ষ লক্ষ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী অবস্থান নেয় এ মসজিদ চত্বরে। অবশেষে কমান্ডো অভিযান ও বিপুল জানমালের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে এ বিক্ষোভ অপসারণ করা হয়। সেথায় প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়। এর পর থেকে মসজিদটিতে তালা ঝুলছে এবং তথায় নামাযও বন্ধ”। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস ডানে ফেলে এগুতেই গাইড আমাদের দেখালেন যে স্থানে তাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এর নিহত হওয়ার স্থান। সেখানেই রয়েছে তার পিরামিড আকৃতির বিশাল সমাধিক্ষেত্র।
এরপর আমরা কায়রো অভিজাত সানসিটি শপিং মল এ গেলাম। বিশাল আধুনিক মার্কেট, অনেকেই কেনা কাটা করলেন। আমাদের টিম লিডার আযহারী ভাই তাঁর স্ত্রীর আবদার মেটাতে একটি বিরাট ফুট প্রসেসর সেট কিনলেন। এর পর আমরা কায়রো আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। স্থানীয় সময় রাত আড়াইটায় সৌদিয়া এয়ার লাইন্সের একটি বিশাল ফ্লাইটে পবিত্র মক্কা মদীনা সফর ও ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ আসনে বসে পড়লাম। শোকর আলহামদুলিল্লাহ মাত্র ৫দিনের মিশর সফরে অনেক কিছু দেখেছি, শিখেছি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। ঐদিনই ওমরার উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ফিরছিলাম। মিশর সফরের শেষ দিন হৃদয়টা অনেক ভারাক্রান্ত ছিল। অনেক কিছু দেখার বাকী রয়ে গেল। এটিই ছিল আমার জীবনে প্রথম মিশর সফর। পুনরায় এ দেশে আর আসা হবে কিনা মহান আল্লাই ভালো জানেন। খুব ভালো লাগলো আমাদের মিশরী গাইড এয়ারপোর্টের একেবারে ইমিগ্রেশান পর্যন্ত সহযোগিতা দিয়ে বিদায় নিলো। তাদের এমন সহযোগিতা ও আন্তরিকতা তাদের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছে মনে হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে উড়োজাহাজ জেদ্দার উদ্দেশ্যে উড়াল দিল। আর আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আরব বসন্তের দেশ, প্রাচীন সভ্যতার দেশ যেখানে হযরত ইব্রাহিম,হযরত ইউসুফ, হযরত মুসা, হযরত হারুন, হযরত ইলিয়াস, হযরত সালেহ, হযরত লুকমান ও হযরত দানিয়েল আলাইহিমুসসালাম সহ নাম না জানা কতো নবী রাসূল এবং সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতি ও পদচারণায় ধন্য দেশ পুণ্য ভূমি মিশরকে বিদায় জানালাম। গুড বাই কায়রো, গুড বাই ফারাও, গুডবাই পিরামিড আর নীল নদের দেশ মিশর (সমাপ্ত)।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

রবিবার, ১৬ জুলাই, ২০১৭

জামালগঞ্জ খেয়াঘাটের খেয়াগুলো যেন মরণ ফাদে পরিণত।সাংবাদিক ভাইদের দৃষ্টি কামনা করি।

জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা টু জামালগঞ্জ নদী পারাপারের একমাত্র খেয়াঘাটের নৌকা গুলো মরণ ফাদে পরিণত।বেশ কয়েকদিন যাবত নৌকার কাঠ গুলো ভাঙ্গাচুড়া অবস্থায় আছে,আমি এ পর্যন্ত কয়েকজনকে দেখেছি এসব কাঠের মধ্যে পা পরে পায়ে আঘাত পেতে, সাথে সাথে কতৃপক্ষকে অবগতও করেছি তখন তারা বলেছে এসব ঠিক করে নিবে কিন্তু এপর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।আজ আমি নিজেও এই দূর্ঘটনার শিকার হয়ে ঘাটে অভিযোগ জানালে প্রতিউত্তরে তারা বলে যে, তারা এব্যাপারে কিছু জানেনা অভিযোগ তারাও করেছে কিন্তু কোন কাজ হয়নি এখন কিছু বলতে হলে যারা ঘাট ইজারা নিয়েছে তাদেরকে বলতে হবে।তাহলে কি এখন পারাপারের খেয়া গুলো এভাবেই মরণ ফাদ হিসাবে থাকবে?আমরা টাকা দিয়ে খেয়া পার হই পা ভাঙ্গার জন্য?আশাকরি সাংবাদিক ভাইয়েরা এ ব্যাপারে একটু নজরদারী করলে আমরা সাধারণ মানুষ বড় ধরণের দূর্ঘটনার কবল থেকে বাচতে পারব।

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০১৭

জীবন বেঁচেছে ,কিন্তু ইজ্জতটা বাঁচবে তো ?


ইন্ডিয়ার স্বনামধন্য সাংবাদিক ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী কুলদীপ নায়ার বলেছেন , Most of the Bangladeshis feel suffocated অর্থাৎ অধিকাংশ বাংলাদেশীর এখন দম বন্ধ হয়ে আসছে । ইনি ইন্ডিয়ায় বসে যা উপলব্ধি করছেন , অনেক বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবী এদেশে বা এ সমাজে অবস্থান করেও সেটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন । 
এই সকল বুদ্ধিজীবীদের বড় একটা অংশ ইসলামফোবিয়ায় আক্রান্ত । পশ্চিমাদের এই ইসলামফোবিয়া বা বর্তমান রোগের অনেক আগেই এদেশে এই রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল । ফরহাদ মজহার যখন বলতেন , There is no God - তখন উনি বিশাল বড় মাপের বুদ্ধিজীবী ছিলেন , মানবতাবাদী দার্শনিক ছিলেন । তার চরিত্র তখন ফুলের মত পবিত্র ছিল । তখন শত শত অর্চনা দেবি ফরহাদ মজহারকে সারাক্ষণ পুজো দিলেও মুন্নী সাহাদের কোনও প্রবলেম হতো না । " প্লেয়ার বনাম প্লেয়ার " শিরোনাম দিয়ে ফরহাদ মজহারের চরিত্র হননের নিমিত্তে এভাবে কোনও অনুষ্ঠান সাজাতেন না । 

কিন্তু যখনই বলা শুরু করলেন , Certainly there is a God - তখনই বুদ্ধিজীবী সার্কেলে ভূমিকম্প শুরু হলো । বুদ্ধিজীবীদের তালিকা থেকে তার নামটি রাতারাতি কাটা পড়ে গেল । এখন সক্রেটিস , প্লুটোর সঙ্গে তুলনা করা তো দূরের কথা -তার মাথায় সামান্য বুদ্ধি অবশিষ্ট আছে কি না সেটা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মুন্নী সাহার আলোচনার সেটে এক জন ভুল করে ফরহাদ মজহারকে প্লুটো , সক্রেটিসদের সঙ্গে তুলনা করে ফেলেছিলেন । অন্যজন সাথে সাথেই এটার প্রতিবাদ করেন । বলাই বাহুল্য এটি ছিল মুন্নী সাহার উপস্থাপনায় ফরহাদ মজহারের চরিত্র হননের একটি বিশেষ অনুষ্ঠান । 

এদের চোখে ফরহাদ মজহার এখন নারীমাংস খাদক , বাটপার, জোচ্চোর , হেফাজতি । যৌবন যার সংযমে কেটেছে বৃদ্ধ বয়সে এসে তিনি যৌনকাতর হয়ে পড়েছেন । সত্তর বছর বয়সে এসে তিনি তার এক দাসীকেও নাকি প্র্যাগনেন্ট বানিয়ে ফেলেছেন ! আল্লাহ খোদায় বিশ্বাস না থাকলেও এদের কেউ কেউ বলছেন , ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ । 

উল্লেখ্য , মানব মানবীর চরিত্রের পুতপবিত্রতা নিয়ে মাত্রাধিক স্পর্শকাতর এই শ্রেণীটির কাছে এখন এরশাদের চরিত্রও ফুলের মত পবিত্র হয়ে পড়েছে । 

ফরহাদ মজহারের অপহরণের পর এদের সেই বিদ্বেষ সকলমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে । ফরহাদ মজহারের জীবন তো রক্ষা পেয়েছে কিন্তু ইজ্জত কতটুকু রক্ষা পাবে , সেটাই এখন দেখার বিষয় । মুন্নী সাহারা গা ঝাড়া দিয়ে লেগে পড়েছেন । এবার অর্চনা দেবির কাহিনী প্রতিষ্ঠিত করে ছাড়বেন ই । কারণ রাষ্চ্রীয় এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমস্ত লজিস্টিক এখন মুন্নী সাহাদের হাতে । যেভাবে চান আজ সেভাবেই সবকিছু সাজাতে পারবেন । অডিও, ভিডিও , গোয়েন্দা রিপোর্ট যা দরকার সবই প্রস্তুত হয়ে পড়বে । 

ফলে ফরহাদ মজহারের জনৈকা দাসীর অস্তিত্বই শুধু আবিস্কৃত হয় নি । সেই দাসী যা যা দাবি করেছেন তার হুবহু ভিডিও প্রমাণ ও মিলে গেছে । অর্থাৎ মুন্নী সাহাদের কেল্লাহ এখন ফতেহ হয়ে পড়েছে । 
ইন্ডিয়ার টিভি চ্যানেলের বদৌলতে আমরা বিখ্যাত নায়ক নায়িকাদের লুক-এলাইক বা দেখতে অনেকটা একই রকম মানুষ দেখেছি । ফরহাদ মজহারের এরকম কাছাকাকাছি চেহারা বা বাহ্যিক গঠণের লুক এলাইক বের করা কঠিন কিছু নহে । বিশেষ করে একটু আবছা আবছা চেহারা দিয়ে বা দূর থেকে যে ভিডিওটি দেখানো হবে - তাকে তো সহজেই আসল ভিডিও বলে চালানো সম্ভব । এটা দেখেই আওয়ামী ভক্ত পাঠককুল ইউরেকা ইউরেকা বলা শুরু করেছে । 

এদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব কতটুকু চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে , তা বোঝা যায় ফরহাদ মজহারকে নিয়ে তথাকথিত এক ছড়াকারের একটি ছড়া দেখে । আমার মনে হয় ছড়া সাহিত্যের সবচেয়ে বড় কলংক হিসাবে চিহ্নিত হবে এই নোংরা ছড়াটি । যেখানে ফরহাদ মজহারকে অপমান করতে গিয়ে পুরো জাতিকেই অপমান করা হয়েছে । ফরহাদ মজহার সর্বদা লুঙ্গি পরেন । এটা তিনি করেন একটা জাতীয়তাবোধ এবং অহংবোধ থেকে । তার এই অহংবোধকে আঘাত ও ছোট করা মানে পুরো জাতির অহংবোধকে আঘাত করা । বঙ্গবন্ধুর লুঙ্গি পরা অনেক ছবি আছে , মাওলানা ভাসানী সহ অনেকেই লুঙ্গি পরে বিদেশে সফরে যেতেন । ফরহাদ মজহারের লুঙ্গি খুলে এই কুলাঙ্গাররা পুরো জাতিকেই নেংটা করে দিয়েছে । 

দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও এই শ্লোগানটি দিয়েছিলেন বিএনপি নেত্রী ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় । আজ ফরহাদ মজহারের মেয়ের চোখে যেন সারা জাতির চরম অসহায়ত্বটি ফুটে উঠেছে । বেগম জিয়ার সেই কথাটি দেশবাসী মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে - দেশ বাঁচাও , মানুষ বাঁচাও । মানুষের জীবন বাঁচাও , ইজ্জত বাঁচাও । 

জানি না ,
কে এখন এই জাতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবেন ?
কোথা থেকে আসবেন ?

মিনার রশিদ

আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের তীব্র প্রতিবাদ: জামায়াত সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান


বাংলাদেশ বার্তাঃ আমাদের সময় পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় “কর্মীরা জেলে- আত্মগোপনে, নেতারা বহাল তবিয়তে ”শিরোনামে ৮ জুলাই প্রকাশিত রিপোর্টেও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারী অধ্যাপক মোঃ তাসনীম আলম আজ ৮ জুলাই প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, “আমাদের সময় পত্রিকায় ৮ জুলাই প্রকাশিত রিপোর্টে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে যে সব কথা লেখা হয়েছে তার কোন ভিত্তি নেই।
বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রায় সকল নেতা-কর্মীই কোননা কোনভাবে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী যারা জেলেবন্দী ও জেলের বাইরে আছেন তাদের সকলের ব্যাপারেই জামায়াত খোঁজ-খবর রাখে এবং সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখে থাকে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কেউ কেউ জামিন পাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ জামিন পাচ্ছেন না। আমাদের সময় পত্রিকা উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে জামায়াতের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আত্ম-গোপনে থাকার অসত্য রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাদের আত্ম-গোপনে থাকার প্রশ্নই আসেনা। 
সরকারই তো জামায়তের কোন নেতা-কর্মীকেই তাদের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান কোথাও স্বস্থিতে থাকতে দিচ্ছেনা। সেখানে আত্ম-গোপনের বিষয়াটি একেবারেই অবান্তর। সমাজের দর্পন হিসেবে গণমাধ্যমের কাছে আশা করি তারা সরকারের অন্যায় ও অনৈতিক বাড়াবাড়ির চিত্রই তাদের লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরবেন।
তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ পর্যন্ত সকলেই সরকারের প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হচ্ছেন। কেউই বহাল তবিয়তে নেই। জামায়াতকে নেতৃত্ব শূন্য করার হীন উদ্দেশ্যেই কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ তৃণমূল পর্যন্ত প্রায় সকল নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদেরকে প্রায় প্রতিনিয়তই হয়রানি করা হচ্ছে। জামায়াতের নেতা-কর্মীগণ সবাই কোননা কোন পেশায় নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি সাংগঠনিক দায়িত্বও পালন করছেন। বর্তমান সরকারের জুলুমের শিকার হয়ে অনেকেই চাকুরী হারিয়েছেন, কারো কারো ব্যবসা, দোকান-পাট, বাড়ী-ঘর, কৃষি খামারসহ বিভিন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমাদের সময়ের রিপোর্টে জামায়াতের জনশক্তির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই নেতা-কর্মীদের মধ্যে বৈষম্যেও কথা কৌশলে প্রচার করা হয়েছে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট প্রকাশ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবেনা।
তাই জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর অসত্য রিপোর্ট প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার জন্য আমি আমাদের সময় পত্রিকা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আশা করছি তারা অত্র প্রতিবাদটি যথাস্থানে ছেপে সৃষ্ট বিভ্রান্তি নিরসন করবেন।”

সোমবার, ১০ জুলাই, ২০১৭

ওয়াসিলা /অসিলা (বা দোহাই): তিন ব্যক্তির এখলাসের ঘটনাঃ

বাংলাদেশ বার্তাঃ  আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, তিনি এরশাদ করেন, 'তোমাদের আগে (বনি ইসরাইলের যুগে) তিন ব্যক্তি একদা সফরে বের হলো। চলতে চলতে রাত এসে গেল। তারা রাত কাটানোর জন্য একটি পর্বত গুহায় প্রবেশ করল। কিছুক্ষণ পরই একটি বড় পাথর ওপর থেকে গড়িয়ে নিচে এসে গুহার মুখ বন্ধ করে দিল। এ দেখে তারা বলল, এ বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের নেক আমলগুলোকে অসিলা বানিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া কর। সুতরাং তারা স্ব-স্ব আমলের অসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগল।
প্রথমজন : 'হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, আমার অত্যন্ত বৃদ্ধ মা-বাবা ছিল এবং আমি সন্ধ্যাবেলায় সবার আগে তাদের দুধপান করাতাম। তাদের আগে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও ক্রীত দাসদাসী কাউকেই পান করাতাম না। একদিন আমি ঘাসের খোঁজে দূরে গেলাম এবং বাড়ি ফিরে দেখলাম, মা-বাবা ঘুমিয়ে গেছেন। আমি সন্ধ্যার দুধ দোহন করে তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে দেখলাম তারা ঘুমিয়ে আছেন। আমি তাদের জাগানো পছন্দ করলাম না এবং এও পছন্দ করলাম না যে, তাদের আগে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও ক্রীত দাসদাসীকে দুধপান করাই। তাই আমি দুধের বাটি নিয়ে ঘুম থেকে জাগার অপেক্ষায় তাদের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অথচ শিশুরা ক্ষুধার তাড়নায় আমার পায়ের কাছে চেঁচামেচি করছিল। এভাবে ফজর উদয় হয়ে গেল এবং তারা জেগে উঠল। তারপর তারা নৈশদুধ পান করল। হে আল্লাহ! আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য করে থাকি, তাহলে পাথরের কারণে যে আমরা গুহায় বন্দি হয়ে আছি এ থেকে তুমি আমাদের উদ্ধার কর।' 
এ দোয়ার ফলস্বরূপ পাথর একটু সরে গেল। কিন্তু তাতে তারা বের হতে সক্ষম ছিল না।
দ্বিতীয়জন : 'হে আল্লাহ! আমার একটি চাচাতো বোন ছিল। সে আমার কাছে সব মানুষের চেয়ে প্রিয়তমা ছিল। (অন্য বর্ণনা মতে) আমি তাকে এত বেশি ভালোবাসতাম, যতবেশি ভালো পুরুষরা নারীদের বাসতে পারে। একবার আমি তার সঙ্গে কুকর্মের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু সে অস্বীকার করল। পরিশেষে সে যখন এক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ল, তখন সে আমার কাছে এলো। আমি তাকে এ শর্তে ১২০ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) দিলাম যেন সে আমার সঙ্গে কুকর্মে লিপ্ত হয়। এতে সে (অভাবের তাড়নায়) রাজি হয়ে গেল। অতঃপর যখন আমি তাকে আয়ত্তে পেলাম। (অন্য বর্ণনা মতে) যখন আমি তার দুই উরুর মাঝে বসলাম, তখন সে বলল, তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং অবৈধভাবে আমার পবিত্রতা নষ্ট কর না। এটা শুনে আমি তার কাছ থেকে দূরে সরে গেলাম; যদিও সে আমার একান্ত প্রিয়তমা ছিল এবং যে স্বর্ণমুদ্রা আমি তাকে দিয়েছিলাম তাও পরিত্যাগ করলাম। হে আল্লাহ! যদি আমি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি তাহলে আমাদের ওপর পতিত মুসিবতকে দূরীভূত কর।' 
এ দোয়ার ফলস্বরূপ পাথর আরও কিছুটা সরে গেল; কিন্তু তাতে তারা বের হতে সক্ষম ছিল না।
তৃতীয়জন : 'হে আল্লাহ! আমি কিছু লোককে মজুর রেখেছিলাম। কাজ শেষ হলে আমি তাদের সবাইকে মজুরি দিয়ে দিলাম। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন মজুরি না নিয়ে চলে গেল। আমি তার মজুরির টাকা ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করলাম। (কিছুদিন পর) তা থেকে প্রচুর অর্থ জমে গেল। অনেক দিন পর ওই মজুর এসে বলল, হে আল্লাহর বান্দা তুমি আমার মজুরি দিয়ে দাও। আমি বললাম, এসব উট, গাভী, ছাগল এবং গোলাম যা তুমি দেখছ সবই তোমার মজুরির ফল। সে বলল, হে আল্লাহর বান্দা, তুমি আমার সঙ্গে উপহাস করছ। আমি বললাম, আমি তোমার সঙ্গে উপহাস করছি না (সত্য কথাই বলছি)। সুতরাং আমার কথা শুনে সে তার সব মাল নিয়ে চলে গেল এবং কিছুই ছেড়ে গেল না। হে আল্লাহ! যদি আমি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি তাহলে যে বিপদে আমরা পড়েছি তা তুমি দূরীভূত করো। এ দোয়ার ফলে পাথর সম্পূর্ণ সরে গেল এবং সবাই (গুহা থেকে) বের হয়ে চলতে লাগল।'
-(বোখারি : ২২৭২; মুসলিম : ১০০)।
সৌজন্যেঃ নিশাত কবিরাজ।

জামায়াতের বাস্তবতাকে কেউই অগ্রাহ্য করতে পারছে না,,,,

 ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় বন্যা দূর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ
 করছেন জামায়াতের  কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর
সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান
বাংলাদেশ বার্তাঃ  সারা দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুঞ্জরণ চলছে। বিভিন্ন দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন ইসলামী দলগুলোকে কাছে টানার চেষ্টাও দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের সাথে গণভবনে বৈঠক করেছেন। মহাজোটের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টি বিভিন্ন দল নিয়ে ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ গঠন করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি ‘ইসলামী দল’ও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাদের অবস্থা আর আগের মতো নেই। কিন্তু অতীতের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা, জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ, চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ার আলোচনাও সেই সাথে চলছে।
গত ৭/৮ বছর যাবত জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা স্বাভাবিকভাবে মাঠে নামতে পারছে না। কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন মহানগর, জেলা, উপজেলা পর্যায়ের অফিসগুলো তালাবদ্ধ। অবর্ণনীয় জুলুম, নির্যাতন, গুম, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে শহীদ করে দেয়ার মধ্যদিয়ে তাদের উপর নির্যাতন স্টিম রোলার চলেছে। এসব দিক বিবেচনায় এনে এবং জামায়াতের নীরবতা দেখে বিশ্লেষকরা কেউ কেউ জামায়াতকে দেশের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন না।
বিয়ানীবাজার উপজেলায় বন্যার্তদের মধ্য ত্রাণ বিতরণ করছে
সিলেট-৬ আসনের সাবেক এমপি পদপ্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার 
সদস্য  ও সিলেট দক্ষিণ জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান
কিন্তু ভোটের হিসাব নিকাশে বসে তারাই আবার ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছেন। বিশেষ করে অতীতের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে জামায়াতে ইসলামী ছিল ক্ষমতায় যাওয়ার একটা ফ্যাক্টর। কেন না ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে সমর্থন দেয়ার কারণে তারা ক্ষমতায় আসীন হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে সমর্থন না দেয়ায় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আবার ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী চারদলীয় জোট গঠনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় আসে। চারদলীয় জোটের বিরোধীদের বিশ্লেষণ ছিল এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০০৬ সালের নির্বাচনেও এই জোট পুনরায় ক্ষমতায় আসবে। এ কারণেই সেই নির্বাচন হতে দেয়া হয়নি। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ১/১১ ঘটানোর মধ্য দিয়ে দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া হয়।
এতো কিছুর পরও জামায়াতের রয়েছে সেই কর্মী, সমর্থক, জনসমর্থন। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের পরপর যেসব উপজেলা নির্বাচন, পৌর নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার সবগুলোতে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করে এবং বিজয়ীও হয়। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন জামায়াতের ৪ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তাই এখনও রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী ফ্যাক্টর। এ কারণেই আলোচনার টেবিলে কেউই জামায়াতের বাস্তবতাকে ‘ইগনোর’ করতে পারছে না।
অতীতে প্রায় প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করেছে জামায়াতে ইসলামী। সেগুলোতে জামায়াতের প্রতিনিধিত্বও ছিল। কয়েকটি নির্বাচনের পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো :
গোলাপগঞ্জ উপজেলায় বন্যার্তদের মধ্য ত্রাণ বিতরণ করছে
 সিলেট-৬ আসনের সাবেক এমপি পদপ্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার 
সদস্য ও সিলেট দক্ষিণ জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমা
২য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৭৬ সালের ২৪ আগস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি, নেযামে ইসলাম পার্টি, খেলাফতে রব্বানী পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (ওউখ) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গড়ে তোলেন। মাওলানা ছিদ্দিক আহমদকে (নেযামে ইসলাম পার্টি) চেয়ারম্যান, মাওলানা আবদুর রহীম (জামায়াতে ইসলামী), মাওলানা আবদুস সুবহান (জামায়াতে ইসলামী), এডভোকেট সা’দ আহমদকে (জামায়াতে ইসলামী) ভাইস চেয়ারম্যান এবং এডভোকেট শফিকুর রহমানকে (ডেমোক্রেটিক লীগ) সেক্রেটারি জেনারেল করে এর কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ দল অংশগ্রহণ করে।
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ২য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০৭টি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৩৯টি এবং মুসলিম লীগ ১৪টি আসনে বিজয়ী হয়। ইসলামিক ডেমোক্রেটি লীগ থেকে মনোনীত জামায়াতে ইসলামীর ৬জন সদস্য জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এটাই প্রথম উপস্থিতি।
তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৮৬ সালের ৭ই মে জাতীয় সংসদের তৃতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নিজ নামে জামায়াতে ইসলামীর এটাই ছিলো জাতীয় সংসদে প্রথম নির্বাচনে অংশ গ্রহন। জামায়াতে ইসলামী ৭৬টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল। এই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়। এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৫৮টি, আওয়ামী লীগ ৯৬টি, জামায়াতে ইসলামী ১০টি, জাসদ ৪টি, অন্যান্য দল ১০টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২২টি আসনে বিজয়ী হয়। জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটা দ্বিতীয় উপস্থিতি।
বালাগঞ্জে বন্যার্তদের মধ্য ত্রাণ বিতরণ করছে সিলেট-২
 আসনের  সাবেক এমপি পদপ্রার্থী ও সিলেট দক্ষিণ 
জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক আব্দুল হান্নান।
৪র্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনরত দলগুলো এ নির্বাচন বর্জন করে।
পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি, আওয়ামী লীগ ৮৬টি, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ৩৫টি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, অন্যান ১৯টি আসনে বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ২২২ জন প্রার্থী দিয়েছিল। ১৮জন বিজয়ী হয়। জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটা তৃতীয় উপস্থিতি।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৯৬ সনের ১২ই জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ। কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান ছিলেন বিচারপতি মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমান। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১১৬টি আসন, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ৩২টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন লাভ করে।
জামায়াতে ইসলামী থেকে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত তিনজন সদস্য ছিলেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (পিরোজপুর), কাজী শামসুর রহমান (সাতক্ষীরা) এবং মিজানুর রহমান চৌধুরী (নীলফামারী)। জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটি চতুর্থ উপস্থিতি।
চারদলীয় জোট গঠন: ১৯৯৯ সনের ৩০শে নবেম্বর ২৯ মিন্টো রোডে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আওয়ামী দুঃশাসন থেকে দেশকে উদ্ধার করার সংকল্প নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেন এবং একটি ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ২০০১ সনের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকালে রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ। কেয়ারটেকার প্রধান ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করার পূর্বে প্রশাসন, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনে তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদেরকেই বসিয়ে যান।
২০০১ সনের ১লা অক্টোবরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আকস্মিকভাবে চারদলীয় জোট ত্যাগ করেন। তবে নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি অংশ চারদলীয় জোটে থেকে যায়।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৯৩টি আসন, আওয়ামী লীগ ৬২টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ১৭টি আসন লাভ করে। সংসদের মহিলা আসনগুলো থেকে জামায়াতে ইসলামী ৪টি আসন লাভ করে। জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এটি পঞ্চম উপস্থিতি।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: জরুরী সরকারের অধীনে ২০০৮ সনের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলী ৩০টি আসনে, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ২৭টি আসনে, জাসদ ৩টি আসনে, ওয়ার্কার্স পার্টি ২টি আসনে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২টি আসনে, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ১টি আসনে, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ১টি আসনে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৪টি আসনে বিজয়ী হয়।
জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত দুইজন সংসদ সদস্য ছিলেন মাওলানা শামসুল ইসলাম (চট্টগ্রাম) এবং এ.এইচ.এম. হামিদুর রহমান আযাদ (কক্সবাজার)। জাতীয় সংসদে এটি জামায়াতে ইসলামীর ষষ্ঠ উপস্থিতি।
২০০১ এর চেয়ে ২০০৮ এ ভোট বাড়ে ৩৫%: ২০০১ সালের চারদলীয় জোটের ভোট বিপ্লবের সময়ের চেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ভোট বৃদ্ধির হার ৩৫ শতাংশ। ২০০১ সালের জামায়াত যেখানে ভোট পেয়েছিল ২৪ লাখ ২৭ হাজার ৫৭৪ আর ২০০৮ সালে ভোট পায় ৩২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৯। ২০০৮ এর নির্বাচনে জামায়াত গড়ে আসন প্রতি ভোট পেয়েছে ৮৬ হাজার ২৭৬, আর ২০০১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৫ হাজার ৮৬২। ২০০৮ এর নির্বাচনে মাত্র ৫ জন প্রার্থী ৫০ হাজারের নীচে ভোট পেয়েছেন। আর ১ লাখের উপর ভোট পেয়েছেন ৩৮ জনের মধ্যে ১৪ জন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জোটবদ্ধ নির্বাচন করেও যেখানে জামায়াতের কয়েকজন প্রার্থী জামানত হারিয়েছিলেন, ২০০৮ এর নির্বাচনে ৩৮ জন প্রার্থীর কেউই জামানত হারায় নি।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সালে ঠাকুরগাও-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুল করিম ভোট পেয়েছিলেন ৯৮ হাজার ৪৫৬, যা প্রদত্ত ভোটের ৪৯ শতাংশ। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি ৫৭ হাজার ১৯৬ ভোট পেয়েছিলেন, যা ছিল প্রদত্ত ভোটের ৩৫ শতাংশ। নীলফামারী-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী মনিরুজ্জামান মন্টু ভোট পেয়েছে ৮২,৩২৪, যা প্রদত্ত ভোটের ৩৭ শতাংশ। ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসনে জামায়াত ভোট পেয়েছিল ৬৫,৮৩৫, যা প্রদত্ত ভোটের ৩৬ শতাংশ। লালমনিরহাট-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী হাবিবুর রহমান ভোট পেয়েছেন ৭৪,২১৯, যা প্রদত্ত ভোটের ৩৪ শতাংশ। ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসনে জামায়াত ভোট পেয়েছিল ৪৮,৯০৭, যা প্রদত্ত ভোটের ২৮ শতাংশ। রংপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম ভোট পেয়েছেন ৩৬,৫৮৬, যা প্রদত্ত ভোটের ১৭ শতাংশ। ২০০১ সালে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ১৭,৭৮৮, যা ছিল প্রদত্ত ভোটের ৯ শতাংশ। গাইবান্ধা-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী আবদুর রহীম সরকার ভোট পেয়েছেন৭০,১১১, যা প্রদত্ত ভোটের ২৫ শতাংশ। চাপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী লতিফুর রহমান ভোট পেয়েছেন ৭১,৩৪১, যা প্রদত্ত ভোটের ৩১ শতাংশ, ২০০১ সালে তিনি পেয়েছিলেন ৬০,৪৬০, যা প্রদত্ত ভোটের ২৮ শতাংশ। শেরপুর-১ আসনে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান প্রদত্ত ভোটের ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১,০১,০৭০। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৬৫,৪৯০ ভোট, যা ছিল প্রদত্ত ভোটের ৩৩ শতাংশ।
২০০৮ সালে প্রথম নির্বাচন করে যারা বেশী ভোট পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন যশোর-১ আসনে মাওলানা আজিজুর রহমান, তিনি প্রদত্ত ভোটের ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৮৮,৭০০। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে রফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৯৭,৪৬৩ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের ৩৪ শতাংশ। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১,৪৩,৪১৮ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের ৪৫ শতাংশ। সিলেট-৬ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান ভোট পেয়েছেন ৫১,৭৬৪, যা প্রদত্ত ভোটের ২১ শতাংশ।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের বিজয়ী ২টি আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে মাওলানা শামসুল ইসলাম ভোট পেয়েছেন ১,২০,১০৫, যা প্রদত্ত ভোটের ৫১ শতাংশ। ২০০১ সালে এ আসনে শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছিলেন ১,০৫,৭৭৩ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের ৪৮ শতাংশ। কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের হামিদুর রহমান আযাদ ভোট পেয়েছেন ১,০৩,১৫১, যা প্রদত্ত ভোটের ৫৩ শতাংশ।
২০০১ সালের নির্বাচনে ৩১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াত ১৭টি আসন লাভ করে। ওই নির্বাচনে ২৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬১ ভোট, অর্থাৎ ৪ দশমিক ২৮ ভাগ ভোট পায়। 
গত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৩৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে জামায়াত মাত্র ২টি আসন পায়। নির্বাচন কমিশনের চড়ান্ত ফলাফলে জামায়াতের প্রার্থীরা ৩২ লাখ ৯ হাজার ২২৬ ভোট পান। এই ভোট সারাদেশে প্রদত্ত ৮৭ দশমিক ১৬ ভোটের ৪ দশমিক ৬০ ভাগ।
২০০৮ সালের নির্বাচনে ১ লাখের উপর ভোট পেয়েছেন ৩৮ জনের মধ্যে ১৪ জন। মাত্র ৫ জন প্রার্থী ৫০ হাজারের নীচে ভোট পেয়েছেন। ২০০১ সালে ১ লাখের উপর ভোট পেয়েছিলেন ১০ জন। ২০০৮ সালে যারা ১ লাখের উপরে ভোট পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন, দিনাজপুর-১ আসনে মোহাম্মদ হানিফ ১,০৭,১৬৮, দিনাজপুর-৬ আসনে আনোয়ারুল ইসলাম ১,৩২,৭৫২, পাবনা-১ আসনে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১,২২,৯৪৪, পাবনা-৫ আসনে মাওলানা আবদুস সুবহান ১,৪১,৬৬৩, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে হাবিবুর রহমান ১,৪৩,৪১৮, যশোর-২ আসনে মুহাদ্দিস আবু সাঈদ ১,৩৩,২৪৪, খুলনা-৫ আসনে মিয়া গোলাম পরওয়ার ১,০৫,৩১২, খুলনা-৬ আসনে শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস ১,১৬,১৬১, সাতক্ষীরা-২ আসনে আবদুল খালেক মন্ডল ১,১৪,৫১৭, সাতক্ষীরা-৩ আসনে রিয়াসত আলী বিশ্বাস ১,৩৩,৮০২, সাতক্ষীরা-৪ গাজী নজরুল ইসলাম ১,১৭,৬৭৫, শেরপুর-১ আসনে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১,০১,০৭০, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে মাওলানা শামসুল ইসলাম ১,২০,১০৫ এবং কক্সবাজার-২ আসনে হামিদুর রহমান আযাদ ১,০৩,১৫১ ভোট।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন : আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এ নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত ২৪ জন উপজেলা চেয়ারম্যান, ২৬ জন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) এবং ১১ জন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান (মহিলা) নির্বাচিত হয়। ব্যাপক কারচুপি ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে ২০১১ অনুষ্ঠিত হয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ১৭২ জন, পুরুষ সদস্য ১,৬২৩ জন, মহিলা সদস্য ৩৬৭ জন। একইভাবে অন্যান্য নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। এ সব ফলাফলে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির পরই জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান।
সুতরাং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকরা দেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে এড়িয়ে চলতে গিয়েও পারছেন না। মহাজোট, এরশাদ জোটে যেসব রাজনৈতিক দলের ভিড় দেখা যাচ্ছে, ভোটের মাঠে তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। গত ৯ বছরে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে সেসব নির্বাচনও এর প্রমাণ। মহাজোটের ছত্রছায়া এবং সরকারে থাকার সুবিধা পেয়েও এরশাদের দলের কোন অস্তিত্ব বিগত স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে জামায়াত দলীয় শীর্ষনেতা ও দলীয় অবকাঠামোর সব হারিয়েও ভোটের মাঠে তারা তাদের সরব উপস্থিতি চিহ্নিত করেছে। এই সত্যটাই এখন এক শ্রেণীর রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের প্রচ- মাথা ব্যথার কারণ, যারা দেশের রাজনীতিতে জামায়াত জিরো দেখতে চায়।
-----লিখেছেন সাংবাদিক সামছুল আরেফীন।

শনিবার, ৮ জুলাই, ২০১৭

সহজ কিছু আমল যার মাধ্যমে আপনি মহান অাল্লাহর রহমতে জান্নাত পেতে পারেন

১- প্রত্যেক ওযুর পর কালেমা শাহাদত পাঠ করুণ। (আশ্হাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা- শারীকা লাহূ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আব্দুহূ ওয়া রাসূলুহূ
أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ)
এতে জান্নাতের ৮টি দরজার যে কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন।(সহিহ মুসলিম- ৪৪১, হাদিস একাডেমি, পবিত্রতা অধ্যায়)

২- প্রত্যেক ফরজ সলাত (নামায) শেষে আয়াতুল কুরসি (সূরা বাকারা- আয়াত ২৫৫) পাঠ করুণ এতে মৃত্যুর সাথে সাথে জান্নাতে যেতে পারবেন।(নাসাই, সহীহ জামে’ ৫/৩৩৯, সিলসিলাহ সহীহাহ্‌ ৯৭২)
৩- প্রত্যেক ফরজ সলাত শেষে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ্, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার এবং ১ বার (লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া ‘আলা কুল্লি শাই’ইন কাদীর পাঠ করুণ 
« لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ».)
এতে আপনার অতীতের সব পাপ ক্ষমা হয়ে যাবে। (সহিহ মুসলিম হাদিস-১২৩৯, হাদিস একাডেমী)
সেই সাথে জাহান্নাম থেকেও মুক্তি পেয়ে যাবেন কেননা দিনে ৩৬০ বার এই তাসবিহগুলো পড়লেই জাহান্নাম থেকে মুক্ত রাখা হয় আর এভাবে ৫ ওয়াক্তে ৫০০ বার পড়া হচ্ছে। (সহিহ মুসলিম হাদিস-২২২০, হাদিস একাডেমী)
৪- প্রতিরাতে সূরা মুলক (৬৭ নাম্বার সুরা) পাঠ করুণ এতে কবরের শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন।(সহিহ নাসাই, সহিহ তারগিব, হাকিম-৩৮৩৯, সিলসিলাহ সহিহাহ-১১৪০, শায়খ আলবানী রঃ হাদীছটি হাসান সহিহ বলেহেন, দ্র: সহীহ তারগীব ও তারহীব, হা/ ১৪৭৫ ও ১৪৭৬)
৫- সুরা ইখলাস ৩বার পড়লে পুরো কুরআন খতমের সওয়াব (বুখারী- ৫০১৫)
সুতরাং যত খুশী পড়ুন, চাইলেই প্রতিদিন শত শতবার কুরআন খতমের সওয়াব পেতে পারেন এভাবে—
৬- সকালে ১০০ বার ও বিকালে ১০০ বার সুবহানাল্লাহিল আজিম ওয়া বিহামদিহি (سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْمِ وَبِحَمْدِهِ) পাঠ করুণ এতে আল্লাহ তা’লা আপনাকে সৃষ্টিকুলের সমস্ত মানুষ থেকে বেশী মর্যাদা দান করবেন। (সুনান আবু দাউদ তাহকিককৃত-৫০৯১)
৭- সকালে ১০০ বার ও সন্ধ্যায় (সন্ধ্যায় বলতে আসর থেকে মাগ্রিবের মধ্যে যে কোন সময়ে) ১০০ বার সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি (سُبْحَانَ اللّهِ وَ بِحَمْدِهِ) পাঠ করুণ এতে কিয়ামতের দিন আপনার চেয়ে বেশী সওয়াব নিয়ে আর কেও উপস্থিত হতে পারবে না। (সহিহ মুসলিম-৬৫৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেসন)
৮- সকালে সূর্য ওঠার আগে এবং বিকালে সূর্য ডোবার আগে অর্থাৎ ফজর সলাত আদায় করে সূর্য ওঠার আগেই এবং বিকালে সূর্য ডোবার আগেই ১০০ বার সুবহানাল্লাহ, ১০০ বার আলহামদুলিল্লাহ্, ১০০ বার আল্লাহু আকবার এবং ১০০ বার (লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া ‘আলা কুল্লি শাই’ইন কাদীর) পাঠ করুণ এতে মক্কায় ১০০ টি উট কুরবানির চেয়ে বেশী সওয়াব, জিহাদে ১০০ টা ঘোড়া পাঠানোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, ১০০ টি গোলাম আযাদ করার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এবং পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে বেশী সওয়াব হবে আপনার। (নাসাই সুনানে কুবরা- ১০৬৫৭, হাদিসটি সহিহ)
৯- ঘুমানোর পূর্বে বিছানায় গিয়ে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ুন, রাসুল সাঃ তাঁর মেয়ে ফাতিমা (রাঃ) এবং আলী (রাঃ)-কে এই আমল করার জন্য বিশেষভাবে নসিহত করেছেন (বুখারী- ৩৭০৫, তাওহীদ পাবলিকেশন)
১০- বাজারে প্রবেশ করে- (লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু য়্যুহয়ী ওয়া য়্যুমীতু ওয়া হুয়া হাইয়ুল লা য়্যামূত, বিয়াদিহিল খাইরু ওয়াহুয়া ‘আলা কুল্লি শাই’ইন কাদীর
«لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ، وَلَهُ الْحَمْدُ، يُحْيِي وَيُمِيتُ، وَهُوَ حَيٌّ لاِ يَمُوتُ، بِيَدِهِ الْخَيْرُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ».)
পাঠ করুণ এতে ১০ লক্ষ পুণ্য হবে, ১০ লক্ষ পাপ মোচন হবে, ১০ লক্ষ মর্যাদা বৃদ্ধি হবে এবং জান্নাতে আপনার জন্য ১ টি গৃহ নির্মাণ করা হবে। (তিরমিজি তাহকিককৃত -৩৪২৮,৩৪২৯ শাইখ আলবানী হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন)

১১- বাড়িতে সালাম দিয়ে প্রবেশ করুণ এতে আল্লাহ তা’লা নিজ জিম্মাদারিতে আপনাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (ইবনু হিব্বান-৪৯৯, সহিহ তারগিব-৩১৬)
১২- জামাতে ইমামের প্রথম তাকবীরের সাথে ৪০ দিন সলাত আদায় করুন অর্থাৎ দেরিতে নয় বরং সলাত আরম্ভ হওয়ার সময়ই শরিক হওয়া এতে আপনি নিশ্চিত জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন। (সূনান আত তিরমিজী [তাহকীককৃত] - হাদিস ২৪১, তাকবিরে উলার ফজিলত অধ্যায়)
১৩- জুমার দিন ১) গোসল করে ২) পায়ে হেটে ৩) আগে আগেই মসজিদে গিয়ে ৪) ইমামের পাশাপাশি বসে ৫) মনোযোগের সাথে খুতবা শুনলে বারি থেকে হেটে আসার প্রতি কদমে ১ বছর সারা রাত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া এবং ১ বছর টানা সিয়াম পালন করার সওয়াব পাবেন (সুনান তিরমিজি তাহকিককৃত- ৪৯৬) 
তাহলে যদি কোন ব্যক্তি এই শর্তগুলো পুরন করে তবে সে যদি বাড়ি থেকে ১০০০ পা ফেলে মসজিদে যায় তবে তার জন্য ১০০০ বছর একটানা সারা রাত তাহাজ্জুদ নামাজের সওয়াব এবং ১০০০ বছর একটানা সিয়াম পালনের সওয়াব দেওয়া হবে, (সুবহানাল্লাহ), এবং কদম যতো বারতে থাকবে সওয়াবও এই একই অনুপাতে বারতে থাকবে।

১৪- সাধ্যমত বেশি বেশি জানাজা সলাতে শরিক হবেন কেননা শুধু জানাজা সলাতে শরিক হলেই এক কীরাত সওয়াব দেওয়া হয় আর দাফন পর্যন্ত থাকলে ২ কিরাত সওয়াব দেওয়া হয় আর ২ কিরাত অর্থ দু’টি বিশাল পর্বত সমতুল্য (সাওয়াব) (বুখারি- ১৩২৫, জানাজা অধ্যায়)
১৫- প্রতিমাসের আয়ের একটা অংশ এতিমখানা বা মসজিদ মাদ্রাসা বা গরিব-দুখি, বিধবা ও দুস্থদের মাঝে দান করবেন হোক সেটা অতি অল্প এতে আপনি আল্লাহ তা’লার কাছে জিহাদকারির সমতুল্য হবেন। (বুখারি-৬০০৭, তাওহীদ পাবলিকেশন)
১৬- মহিলারা ৪টি কাজ করবেন, ১) ৫ ওয়াক্ত সলাত ২) রমজানের সিয়াম, ৩) লজ্জাস্থানের হেফাজত, ৪) স্বামীর আনুগত্য করুণ এতে জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। (সহিহ ইবনু হিব্বান-৪১৬৩, মুসনাদে আহমাদ-১৬৬১, তবরানি কাবির-৯৯১)
১৭- মসজিদে ফজরের সলাত আদায় করে বসে দোয়া জিকির পাঠ করুণ এবং সূর্য উঠে গেলে ২ রাকাত ইসরাকের সলাত আদায় করুণ এতে আপনি প্রতিদিন নিশ্চিত কবুল ১ টি হজ্জ ও ১ টি উমরার সওয়াব পাবেন আর কবুল হজ্জের সওয়াব জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। (সূনান আত তিরমিজী [তাহকীককৃত] – ৫৮৬, জুমু’আর নামায অধ্যায়) 
(মহিলারাও বাড়ীতে ফজর সলাত আদায় করে যদি মুসল্লায় বসেই দোয়া জিকির পাঠ করে এবং সূর্য উঠে গেলে ২ রাকাত ইসরাকের সলাত আদায় করে তাহলে তারাও এই সওয়াব পাবে বলে শাইখ বিন বাজ রঃ-এর ফতওয়া রয়েছে সুতরাং চাইলেই এই বিশাল সওয়াব প্রতিদিন ই অর্জন করা সম্ভব)
বিঃদ্রঃ ফরজ ইবাদতগুলো করার পাশাপাশি শির্ক, বিদআত ও হারাম ভক্ষণ থেকে দূরে থেকে (কেননা এই ৩ পাপে লিপ্ত থাকলে কোন ইবাদতই কবুল করা হয়না) যে কেও এই অতি সহজ আমলগুলো করবে সে সহজেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে ইন শা আল্লাহ। কিয়ামতের দিন পাপ পুণ্য মিজানের পাল্লায় মাপা হবে, পুণ্যের পাল্লা ভারি হলেই কেবল জান্নাত পাওয়া যাবে তাই আমলগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পুণ্যের পাল্লা ভারি করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। 
আল্লাহ, তাওফিক দিন। অামিন।